গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অন্তত আট হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ চাপা পড়ে আছে বলে জানিয়েছে আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল। তবে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে এসব মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সময়ে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল বলেন, বর্তমানে তাদের হাতে থাকা সরঞ্জাম অত্যন্ত পুরোনো এবং গত দুই বছরে ইসরাইলি সামরিক অভিযানে সৃষ্ট ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ অপসারণে তা একেবারেই অপ্রতুল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মরদেহের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য সামনে আসছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, উপত্যকাজুড়ে ইঁদুর ও বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর বিস্তার ঘটেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরাইল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেবল ইঁদুরনাশক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, গাজাজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ জমে আছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। ইসরাইলি বিমান হামলা, স্থল অভিযান ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের কারণে ১ লাখ ২৩ হাজারেরও বেশি ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া প্রায় ৭৫ হাজার ভবন আংশিক বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে গাজার মোট স্থাপনার প্রায় ৮১ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক হিসাব অনুযায়ী, পুরো গাজা পরিষ্কার করতে ব্যয় হতে পারে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর মিশর, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সম্মত হয় ইসরাইল ও হামাস। এর পরদিন, ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
অন্যদিকে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সহিংস ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অনুমোদনের পথে এগোচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর বরাতে জানা যায়, সোমবার ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে এ তথ্য জানান ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস।
তিনি বলেন, হাঙ্গেরির নতুন সরকার আগের মতো এ পদক্ষেপে বাধা দেবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। এর ফলে সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পথ অনেকটাই উন্মুক্ত হয়েছে। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বান দীর্ঘদিন ধরে এই উদ্যোগ আটকে রেখেছিলেন। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবস্থার পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
কালাস আশা প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে এবং তারা পরবর্তী পদক্ষেপে কতটা প্রস্তুত, তা এখন মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভাল্টোনেন বলেন, পশ্চিম তীরে সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অপেক্ষায় আছেন তিনি। তার মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজা ও পশ্চিম তীর—দুই অঞ্চলের পরিস্থিতিই উদ্বেগজনকভাবে অবনতি হয়েছে।
ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেনডসেন আরও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং এসব ঘটনায় কার্যত দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ জন এবং আটক হয়েছেন প্রায় ২২ হাজার মানুষ।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যোদ্ধারা গাজা থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে আকস্মিক হামলা চালায়। এতে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ইসরাইলি বসতিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং বহু মানুষ জিম্মি হন। এর জবাবে হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ধ্বংস এবং জিম্মিদের উদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে গাজায় বড় পরিসরে সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইল।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত গাজায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ।