নির্ভীক কন্ঠ: ডিজিটাল রিপোর্ট ৭ জুন ২০২৬ , ৩:৪০:০০ প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ৭ জুন, ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত ছয় দফা দাবির সমর্থনে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতাল চলাকালে নিরস্ত্র জনতার ওপর পুলিশ ও তৎকালীন ইপিআর গুলি চালায়। এতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন নিহত হন।

শহীদদের রক্তে সঞ্জীবিত হয়ে ছয় দফা আন্দোলন দ্রুত সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নতুন গতি লাভ করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফার পক্ষে দেশজুড়ে ব্যাপক গণআন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তীকালে এই ছয় দফাই বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীসহ বহু নেতা সংগ্রাম করেছেন। তবে ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেই আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে এবং আরও সুসংগঠিত রূপ পায়।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
ছয় দফার প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া বাকি সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা, পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক ও সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা, কর আদায়ের দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারের হাতে রাখা, দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব সংরক্ষণ এবং পূর্ববাংলার নিরাপত্তা জোরদারে আধা-সামরিক বাহিনী গঠন ও নৌবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন।
এসব দাবির সমর্থনে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন বাঙালি শহীদ হন। সেই ঘটনার পর থেকেই বাঙালির সংগ্রাম নতুন মোড় নেয়। পরবর্তী সময়ে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, গণআন্দোলন এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের পথে জাতিকে এগিয়ে নিতে ছয় দফা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধীরে ধীরে এটি বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা এবং সে সময়ের ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘ছয় দফা আন্দোলন দমিয়ে দিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলন যখন থামানো সম্ভব হচ্ছিল না, তখন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য” নামে পরিচিত আগরতলা মামলা দায়ের করেন। ছয় দফা বাস্তবায়ন এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আমরা ছাত্রসমাজ ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি এবং ছয় দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে দেশের গ্রাম, শহর, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে দিই।’
ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছয় দফা একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময়ের ছয়টি দাবি শুধু একটি আন্দোলনের ভিত্তিই গড়ে তোলেনি, বরং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

















