স্বাস্থ্য

দেশব্যাপী হামের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবে প্রাণ হারিয়েছে ২৫০-রও বেশি শিশু

  প্রতিনিধি ২ মে ২০২৬ , ৭:৫৪:৪৫ প্রিন্ট সংস্করণ

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ বিস্তার দেখা দিয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে ৩২ হাজারেরও বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বড় অংশই শিশু। স্বনামধন্য বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তনের ফলে সারা দেশে যে তীব্র টিকার সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটিই বর্তমানে এই মহামারি পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

**হাসপাতালগুলোর মর্মান্তিক চিত্র**
হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ঢাকার হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে এক বিশৃঙ্খল ও হৃদয়বিদারক অবস্থা। সংক্রামক রোগের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলো রোগীতে ঠাসা। শয্যার অভাবে অনেক শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালে কনিকা আক্তার নামের এক মায়ের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। সেদিনই তার ছয় মাস বয়সী যমজ কন্যা রিসা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে তার অপর কন্যা রুহি একই আইসিইউ বেডে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।

**যেখান থেকে বিপর্যয়ের শুরু**
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পেয়েছে। ইউনিসেফ ও ‘গাভি’ (Gavi)-এর সহযোগিতায় নিয়মিত হাম-রুবেলা (MR) টিকা প্রদান করা হতো। তবে ‘সায়েন্স’ সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেয়।

ইউনিসেফ সে সময় এই সিদ্ধান্তের কঠোর বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল, এর ফলে টিকাদান ব্যবস্থায় ভাঙন দেখা দিতে পারে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস জানান, তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে বারবার এই পদক্ষেপ থেকে সরে আসার অনুরোধ করেছিলেন।

নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টিকার সরবরাহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফলে সারা দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

**পুষ্টিহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা**
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এই প্রাদুর্ভাবের সূচনা হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানান, ২০২৪ সাল থেকে দেশে ভিটামিন-এ বিতরণের তিনটি ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। শিশুদের অপুষ্টি এবং ভিটামিন-এ ঘাটতি হামের মৃত্যুহার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

**জবাবদিহিতা ও আইনি পদক্ষেপ**
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে ঘিরে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও ক্ষোভ বাড়ছে। গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন, যেখানে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান ‘সায়েন্স’ সাময়িকীকে দেওয়া এক ইমেইল বার্তায় দাবি করেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তারা জরুরি আইনের পরিবর্তে প্রচলিত নিয়মে টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় কোথায় ত্রুটি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

**বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ**
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, এপ্রিল মাস থেকে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু হয়েছে।

গত ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, হামের দ্রুত বিস্তারের কারণে এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে। আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন।

আরও খবর

Sponsered content