জাতীয়

আরো বাড়বে লোডশেডিং

  প্রতিনিধি ২৪ এপ্রিল ২০২৬ , ২:৪৮:৪৩ প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির ঘাটতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে আগামী দেড় থেকে দুই মাস পর্যন্ত কমবেশি লোডশেডিং চলতে পারে। এমনকি কিছু সময় লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও জ্বালানি বিভাগের কর্মপরিকল্পনা এবং আমদানি পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল, কয়লা ও এলএনজি আমদানিতে সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবেই গ্রীষ্মকাল জুড়ে লোডশেডিং অব্যাহত থাকতে পারে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার বিকাল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট, ফলে ২ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়ে লোডশেডিং করতে হয়েছে।

এদিকে কয়লাভিত্তিক আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে, যা ২৬ এপ্রিল পুনরায় চালু হতে পারে। পাশাপাশি বাঁশখালীর এস আলমের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমে গেছে, যা ২৮ এপ্রিল থেকে পুনরুদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে মোট ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে সেচ কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্য গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ভারসাম্য রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্য—বিশেষ করে তেল, কয়লা ও এলএনজি—আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া আগের সরকারের সময় জমে থাকা বকেয়া, লোকসান ও অর্থ পাচারের ফলে সৃষ্ট আর্থিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির পর সরকার আগের নিয়মিত উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি না করে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করছে, যার ফলে উন্মুক্ত দরপত্র বা জিটুজি চুক্তির তুলনায় বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে যে অর্থ প্রয়োজন, তা সংগ্রহে সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা কমিয়ে আনা হয়েছে এবং ব্যয়বহুল জ্বালানির কারণে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কম চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সরকার গ্যাসভিত্তিক কিছু কেন্দ্র এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা জানান, জ্বালানির ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন হতে পারে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি থাকবে, যা পূরণে লোডশেডিং করা ছাড়া উপায় নেই।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস ও জ্বালানির স্বল্পতার কারণে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বুধবার গ্যাস থেকে ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে, যদিও মোট সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গ্যাসের অভাবে অর্ধেকেরও কম উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জনগণকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান এবং উল্লেখ করেন, কারিগরি সমস্যার কারণে অনেক সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে হলে প্রতিদিন ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। যদি ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যেত, তাহলে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। উৎপাদন ব্যয় কম রাখতে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ব্যবহার কমানো হয়েছে।

এদিকে গত ২১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ বিভাগের আবেদনের ভিত্তিতে ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। তবে এই অর্থ শুধুমাত্র বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নিজস্বভাবে অর্থ বণ্টন করলেও এখন এক খাতের ভর্তুকি অন্য খাতে স্থানান্তর করার সুযোগ নেই।

পিডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। তবে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি বা জ্বালানি পণ্যের দাম আরও বাড়লে এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে আগামী তিন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়তে পারে। এলএনজির দাম আরও বৃদ্ধি পেলে এই ব্যয় আরও বাড়বে। অর্থাৎ, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় পিডিবি মনে করছে, ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ডলার বা জ্বালানির মূল্য আরও বাড়লে এই ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা আরও বৃদ্ধি পাবে।

আরও খবর

Sponsered content