সারাদেশ

ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল ইমামকে, ডিএনএ পরীক্ষায় বেরিয়ে এলো সন্তানের প্রকৃত পিতার পরিচয়

  প্রতিনিধি ৭ মে ২০২৬ , ৮:৪৬:১১ প্রিন্ট সংস্করণ

ফেনীর পরশুরামে কিশোরী ধর্ষণের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগ করা এক মসজিদের ইমাম শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, কিশোরীর নবজাতক সন্তানের জৈবিক পিতা তারই আপন বড় ভাই। প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে ওই ইমামকে মামলায় জড়ানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরী ২০১৯ সালে স্থানীয় একটি মক্তবে পড়াশোনা শেষ করে। প্রায় পাঁচ বছর পর সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান জন্ম দিলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই মক্তবের শিক্ষক ও স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের (২৫) বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলা হয়।

২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর মা বাদী হয়ে পরশুরাম মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে একই বছরের ২৬ নভেম্বর মোজাফফর আহমদ ফেনীর আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান।

মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর মোজাফফর আহমদ ও কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব নমুনা ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ফলে মোজাফফরের ডিএনএ’র সঙ্গে তুলনামূলক মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে কিশোরী ও তার নবজাতক কন্যাশিশুর জৈবিক পিতা শনাক্ত করতে নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করে পুলিশ। তদন্ত চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী একপর্যায়ে স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই (২২) দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করে আসছিল। বিষয়টি গোপন রাখতে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফরকে মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করেন।

পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে অভিযুক্ত ভাইকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি আপন বোনকে ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেন।

আদালতের নির্দেশে একই বছরের ৪ আগস্ট কিশোরী, তার কন্যাশিশু এবং অভিযুক্ত বড় ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট প্রকাশিত ডিএনএ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, অভিযুক্ত ভাইয়ের সঙ্গে শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কারাভোগ করা মোজাফফর আহমদ ওই শিশুর জৈবিক পিতা নন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরশুরাম মডেল থানার উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনা ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯(১) ধারার মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কিশোরীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একই ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে আছেন।

এ বিষয়ে মোজাফফর আহমদ বলেন, “সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়েও আমাকে কারাভোগ করতে হয়েছে। সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছি, হারাতে হয়েছে মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশের জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে দীর্ঘদিন কাউকে কিছু বলতে পারিনি। এখন সত্য প্রকাশ্যে আসায় মানুষ প্রকৃত ঘটনা জানতে পারছে। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই।”

মোজাফফর আহমদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করলে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনে কত ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে, এই ঘটনাই তার বড় উদাহরণ। তিনি বলেন, “একজন নির্দোষ ইমামকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষার মতো বৈজ্ঞানিক তদন্ত না হলে প্রকৃত অপরাধী হয়তো আড়ালেই থেকে যেত। সমাজের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।”

পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, পুলিশ শুরু থেকেই অভিযোগের পাশাপাশি তথ্যপ্রমাণ ও ডিএনএ পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করেছে। ডিএনএ রিপোর্টে প্রকৃত সত্য উঠে আসার পর ওই ইমামের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের ঘটনা সমাজে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।

আরও খবর

Sponsered content