প্রতিনিধি ৭ মে ২০২৬ , ৮:২১:১৪ প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের বিরুদ্ধে ফের কড়া ভাষায় অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী ভারতকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, ভারতের বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী তোমরাই। তোমাদের কথা কেউ শোনে না, বিশ্বাসও করে না।”

বৃহস্পতিবার (৭ মে) পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
‘মারকা-ই-হক’-এর এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন আইএসপিআর প্রধান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীর উপপ্রধান (অপারেশনস) রিয়ার অ্যাডমিরাল শাফাআত আলী এবং বিমানবাহিনীর উপপ্রধান (প্রকল্প) এয়ার ভাইস মার্শাল তারিক গাজী।
গত বছরের ২২ এপ্রিল পেহেলগাম হামলার পর শুরু হওয়া ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনা, পাকিস্তানের ‘অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুস’ এবং ১০ মে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হওয়া ঘটনাপ্রবাহকে পাকিস্তান ‘মারকা-ই-হক’ বা ‘সত্যের যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আহমেদ শরিফ চৌধুরী ‘মারকা-ই-হক’-এর প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেছে এবং বহুমাত্রিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করেছে।
তিনি বলেন, “আজ আমরা শুধু কী ঘটেছিল তা নয়, বরং ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও আলোচনা করব।” একইসঙ্গে এই সংঘাতের “কৌশলগত প্রভাব” তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি।
আইএসপিআর প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মারকা-ই-হক’-এর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ফলাফল রয়েছে। এর প্রথমটি হলো— পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে উপস্থাপনের ভারতীয় প্রচারণা ভেস্তে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে ভারতে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। পেহেলগাম হামলার এক বছর পার হলেও পাকিস্তানের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, “পেহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ কোথায়?” এরপরই ভারতকে উদ্দেশ করে বলেন, “কেউ এসব বিশ্বাস করে না। সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী তোমরাই।”
তার মতে, দ্বিতীয় কৌশলগত ফলাফল হলো— আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, “এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা রক্ষাকারী শক্তি পাকিস্তান এবং বর্তমান নেতৃত্ব।”
তৃতীয় কৌশলগত প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ভারতের সামরিক বাহিনী ক্রমেই রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বও সামরিক মনোভাব গ্রহণ করছে। তিনি বলেন, “একসময় ভারতীয় সামরিক বাহিনী পেশাদার ছিল, কিন্তু এখন সেটি রাজনীতিকরণের শিকার।”
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে অতিরিক্ত যুদ্ধবাজ মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা তিনি বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেন।
ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশটিতে সংখ্যালঘু ও কাশ্মীরিদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে। তার দাবি, এটি এক ধরনের “অহংকার ও ভ্রান্ত শ্রেষ্ঠত্ববোধ” থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ সংকট আড়াল করতেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি বলেন, “কাশ্মীর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখানো যায় না, কিংবা সেখানে জোরপূর্বক জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।”
এ সময় তিনি পুনরায় অভিযোগ করেন, ভারত পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে। এমনকি নিজেদের দেশে সংঘটিত সহিংসতার দায়ও অন্যদের ওপর চাপানো হয় বলে দাবি করেন।
তার ভাষায়, “‘মারকা-ই-হক’-এর পর বিশ্ব এখন ভারতের এই দ্বিমুখী আচরণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেয়েছে।”
পঞ্চম কৌশলগত ফলাফল হিসেবে তিনি ভারতীয় গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, এই সংঘাতের সময় তাদের “তথ্যযুদ্ধ ও প্রচারণার দুর্বলতা” প্রকাশ পেয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। তিনি দাবি করেন, ‘মারকা-ই-হক’-এর পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে গেলেও অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
আহমেদ শরিফ চৌধুরীর অভিযোগ, পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “‘মারকা-ই-হক’ থেকে শিক্ষা পাওয়ার পর ভারত কাকে ফোন করেছিল, সেটাও সবাই দেখেছে— তারা আফগান তালেবান সরকারের তথাকথিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।”

















