বিশ্ব সংবাদ

ঈদগাহে নামাজের অনুমতি না মেলায় আতঙ্কে ভারতের মুসলিমরা

  নির্ভীক কন্ঠ: ডিজিটাল ডেক্স ২৮ মে ২০২৬ , ৪:১২:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি ছোট মসজিদে ঈদুল আজহার নামাজ আয়োজন নিয়ে প্রস্তুতি চলছে। তবে উৎসবের আনন্দের চেয়ে সেখানে উদ্বেগই বেশি দেখা যাচ্ছে। আলোচনার মূল বিষয় কোরবানি নয়; বরং রাস্তা ব্যবহার, পুলিশি অনুমতি, ব্যারিকেড এবং কোথায় ও কীভাবে নামাজ আদায় করা হবে—এসব বিষয়।

দিল্লি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে মসজিদ কমিটির সদস্যরা মুসল্লিদের সতর্ক করছেন—মসজিদের বাইরে ভিড় না করতে, কোনো বিতর্কে না জড়াতে এবং উসকানিতে প্রতিক্রিয়া না দেখাতে। স্থানীয় পুলিশের বার্তায় প্রকাশ্যে নামাজ না পড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা মুসল্লিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মালিয়ানা গ্রাম মুসলিমদের জন্য একটি বেদনাদায়ক স্মৃতির স্থান। ১৯৮৭ সালে সেখানে ৭২ মুসলিম নিহত হন। তবে বর্তমান উদ্বেগ মূলত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদের নামাজকে ঘিরে বাড়তে থাকা বিধিনিষেধ থেকে তৈরি হয়েছে।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন ডানপন্থী সংগঠন রাস্তা বা খোলা জায়গায় মুসলিমদের নামাজের বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি, এতে যানজট ও নিরাপত্তা সমস্যা হয়। অন্যদিকে মুসলিমদের বক্তব্য, জনবহুল এলাকায় মসজিদে জায়গা না থাকায় অনেক সময় সাময়িকভাবে রাস্তার অংশ ব্যবহার করা ছাড়া উপায় থাকে না।

সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) সারা দেশে রাস্তার ওপর নামাজ নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। একই সময়ে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ‘শিফটে’ ঈদের নামাজ আদায়ের পরামর্শ দেন। এরপর মুসলিমদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের বছরগুলোতে খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার কারণে মামলা, পুলিশি হয়রানি, এমনকি বাড়িঘর ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এবার অনেক পরিবার মানুষকে ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছে।

এ কারণে উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ কমিটিগুলো ঈদের আয়োজন সীমিত করছে। কোথাও জামাত ছোট করা হচ্ছে, কোথাও মুসল্লিদের ছোট ছোট দলে আসতে বলা হচ্ছে। নামাজ শেষে দ্রুত চলে যাওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, এখন উদ্বেগ শুধু নামাজের স্থান নিয়ে নয়; বরং মুসলিমদের প্রকাশ্যে ধর্মীয়ভাবে একত্র হওয়াকেও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন নিয়েও। অনেকেই বলছেন, আগে ঈদ আনন্দের উৎসব ছিল, এখন তার সঙ্গে দুশ্চিন্তাও জড়িয়ে গেছে—পুলিশি নজরদারি, ভিডিও ধারণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের ভয় কাজ করছে।

শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের মধ্যে মানসিক চাপও বাড়ছে। অনেক পরিবার তরুণদের মসজিদের বাইরে দাঁড়াতেও নিরুৎসাহিত করছে। এখন ঈদের প্রস্তুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কীভাবে কোনো বিতর্ক বা সমস্যায় না জড়ানো যায়।

এই পরিস্থিতি শুধু উত্তর প্রদেশে নয়; দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গসহ আরও কয়েকটি এলাকাতেও একই ধরনের কড়াকড়ি দেখা যাচ্ছে। তবু বাজার, কেনাকাটা ও ঈদের প্রস্তুতি চলছে আগের মতোই। তবে উৎসবের আনন্দের আড়ালে চাপা উদ্বেগ স্পষ্ট।

কোরবানির ক্ষেত্রেও এবার বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। পশুর রক্ত বা বর্জ্য যেন রাস্তায় না যায়, সে বিষয়ে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে মুসলিম ধর্মীয় চর্চা নিয়ে বিতর্কও বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে নামাজ নিয়ে এই বিতর্ক আসলে ভারতের জনপরিসরে মুসলিমদের দৃশ্যমানতা, অধিকার ও অবস্থান নিয়ে বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকার বলছে, এসব ব্যবস্থা জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য নেওয়া হচ্ছে। তবে সমালোচকদের দাবি, আইন প্রয়োগে বৈষম্যের ধারণা মুসলিমদের মধ্যে আরও গভীর হচ্ছে।

সূত্র:আল জাজিরা

আরও খবর

Sponsered content