নির্ভীক কন্ঠ: ডিজিটাল ডেক্স ৮ আগস্ট ২০২৬ , ২:৫৩:৫৪ প্রিন্ট সংস্করণ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ, পোড়ানো ছাড়াই বিদ্যুৎ ও নানা পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা

রাজধানী ঢাকার আধুনিক অবকাঠামোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট। দিনের শুরুতে পরিচ্ছন্ন থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে বিভিন্ন সড়ক, ফুটপাত ও আশপাশের এলাকায় জমে যায় প্লাস্টিক, পচনশীল বর্জ্যসহ নানা ধরনের আবর্জনা। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এত দিন বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে ধারণা সামনে ছিল, তার পাশাপাশি এখন বর্জ্য না পুড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।
রাজধানীতে বর্জ্য সংগ্রহ ও স্থানান্তরের জন্য ২০১৬ সাল থেকে দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শতাধিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে আগের তুলনায় রাস্তার পাশে খোলা ডাস্টবিন ও বড় কনটেইনারের ব্যবহার কমেছে। তবে অনেক এসটিএস অপরিকল্পিত স্থানে নির্মিত হওয়া, জায়গার সংকট এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি আশপাশে দুর্গন্ধও তৈরি হচ্ছে।
এই সংকট কমাতে আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুটি বড় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোতে বিপুল পরিমাণ নগর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন করা হবে। মিথেন গ্যাস, জৈব সার, পশুখাদ্য এবং পরিবেশবান্ধব ইকো-ব্রিকস উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
গত ১২ জুলাই সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রকল্প দুটির অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প চালু হলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে দুই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রকল্পটি মূলত ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ পদ্ধতিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ডিএসসিসির পরিকল্পনায় বর্জ্য পোড়ানোর পরিবর্তে তা প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। উত্তর সিটির প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে একটি চীনা পরিবেশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। দক্ষিণ সিটির প্রকল্পে কাজ করছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি বিএন্ডএফ।
বর্জ্য পোড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে পরিবেশবিদদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নগর বর্জ্যের বড় অংশই ভেজা ও পচনশীল জৈব উপাদান। এ ধরনের বর্জ্যের তাপ উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় তা পোড়াতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বা রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য পোড়ানোর ক্ষেত্রে ক্ষতিকর গ্যাস ও দূষক তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে বর্জ্য কমানোর পাশাপাশি বায়ুদূষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
ডিএসসিসির পরিকল্পিত প্রকল্পে প্রতিদিনের প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য পোড়ানোর পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এই গ্যাস ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব করা হয়েছে। দৈনিক হিসাবে উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা হতে পারে।
এ ছাড়া প্রকল্পে বছরে প্রায় ৪১০ টন জৈব সার, ২০ টন বিএসএফ প্রোটিন, ১১ দশমিক ৫২ টন বিএসএফ তেল, ৪৭ হাজার ৭৭৫ লিটার পাইরোলাইসিস তেল, ৭ দশমিক ৩৫ টন পাইরোলাইসিস ব্ল্যাক কার্বন, ২৫৫ টন সলিড রিকভারড ফুয়েল (এসআরএফ) এবং ১২৮ টন ইকো-ব্রিকস উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য ধরা হয়েছে আগামী জানুয়ারি থেকে। প্রকল্পের মেয়াদ ১৫ বছর নির্ধারণের কথা রয়েছে।
চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, জমি সরবরাহ ছাড়া ডিএসসিসির বড় ধরনের সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না; প্রকল্পের মূল বিনিয়োগ বিদেশি উৎস থেকে আসার কথা। উৎপাদিত পণ্য বিক্রির লভ্যাংশের ২০ শতাংশ ডিএসসিসি পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের জায়গা ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে একদিকে রাজধানীর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে, অন্যদিকে তা থেকে বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে নগরের পরিচ্ছন্নতা বাড়ার পাশাপাশি বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের পথও তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৪৫ একর জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ একর জমি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে এমওইউ সই হয়েছিল। তবে এখনো প্রকল্পের সব বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও প্রক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে বৈঠক হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

















