প্রতিনিধি ৯ মে ২০২৬ , ৮:৫৮:৫৩ প্রিন্ট সংস্করণ
আটলান্টিক মহাসাগরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের নিয়ে যাত্রা করা বিলাসবহুল প্রমোদতরী ‘এমভি হন্ডিয়াস’-এ হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাস আগে আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই প্রমোদতরীতে এখন পর্যন্ত তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
এছাড়া চিকিৎসার জন্য আরও চারজন যাত্রীকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভাইরাসটির সংস্পর্শে এসেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে—এমন ব্যক্তিদের শনাক্তে ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে। এদের অনেকেই ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিমানে ফিরে গেছেন।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি এখনও তুলনামূলক কম। তারপরও প্রশ্ন উঠছে—এই ভাইরাস নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে?
### কীভাবে সামনে এলো এই ভাইরাসের বিষয়টি?
১ এপ্রিল বিশ্বের দক্ষিণতম শহর হিসেবে পরিচিত আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে এমভি হন্ডিয়াস। ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস পরিচালিত এই বিলাসবহুল জাহাজটির গন্তব্য ছিল ব্রিটিশশাসিত দক্ষিণ জর্জিয়া অঞ্চল।
ভ্রমণটির বিজ্ঞাপনে আটলান্টিক মহাসাগরের দুর্গম ও তুলনামূলক কম পরিচিত অঞ্চল ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। শুরুতে প্রায় ২৮টি দেশের দেড় শতাধিক যাত্রী ও ক্রু সদস্য এই জাহাজে ছিলেন। তাদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিপাইন, রাশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকও ছিলেন।
১১ এপ্রিল জাহাজে থাকা এক ডাচ নাগরিকের মৃত্যু হয়। তখন তার মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট জানা যায়নি। প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ২৪ এপ্রিল তার মরদেহ ও স্ত্রীকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নামানো হয়। পরে ওই নারীকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হলে সেখানকার একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
পরবর্তীতে ডব্লিউএইচও নিশ্চিত করে যে, ৬৯ বছর বয়সী ওই নারী হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এরপর ২ মে জাহাজের আরও এক জার্মান যাত্রীর মৃত্যু হলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনজনে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার জানায়, জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া দুজনের শরীরে হান্টাভাইরাসের অ্যান্ডিস স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে। এই ধরনটি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম বলে পরিচিত।
জাহাজটি সেন্ট হেলেনায় নোঙর করার সময় সাতজন ব্রিটিশ নাগরিকসহ মোট ৩০ জন যাত্রী সেখানে নেমে যান। জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস জানিয়েছে, তাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে তারা জানায়, নেদারল্যান্ডস থেকে দুইজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ পাঠানো হচ্ছে। কেপ ভার্দে থেকে জাহাজটির পরবর্তী যাত্রাপথে সুযোগ পেলে তারা জাহাজে উঠবেন।
বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলবর্তী দ্বীপপুঞ্জ কেপ ভার্দের কাছে কয়েকদিন অবস্থান শেষে এমভি হন্ডিয়াস স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
### হান্টাভাইরাস কী?
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর শরীরে থাকা এক ধরনের ভাইরাস। সাধারণত ইঁদুরের শুকনো মল, প্রস্রাব বা লালা বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে শ্বাসের মাধ্যমে তা মানুষের দেহে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইঁদুরের বর্জ্য থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণার মাধ্যমেই ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। যদিও খুব বিরলভাবে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকেও সংক্রমণ হতে পারে।
এই ভাইরাস প্রধানত দুটি জটিল রোগ সৃষ্টি করে। এর একটি হলো হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস)। শুরুতে এতে জ্বর, দুর্বলতা ও পেশিতে ব্যথা দেখা দেয়। পরবর্তীতে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, কাঁপুনি এবং পেটের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। শ্বাসপ্রশ্বাসে জটিলতা তৈরি হলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে সিডিসি।
অন্যদিকে দ্বিতীয় রোগটি হলো হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (এইচএফআরএস), যা তুলনামূলক বেশি মারাত্মক এবং কিডনিতে গুরুতর প্রভাব ফেলে। এতে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
### বিশ্বে কতটা বিস্তার রয়েছে?
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে গুরুতর হান্টাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর বড় অংশ ইউরোপ ও এশিয়ায় দেখা যায় এবং অর্ধেকের বেশি সংক্রমণ চীনে ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৩ সালে নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ৮৯০টি কেস নথিভুক্ত হয়েছে।
হান্টাভাইরাসের একটি বহুল পরিচিত ধরন ‘সিউল ভাইরাস’, যা নরওয়ে ইঁদুর বা ব্রাউন র্যাটের মাধ্যমে ছড়ায়। এই ইঁদুর বিশ্বজুড়েই পাওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়।
### চিকিৎসা কী?
হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়। সিডিসির পরামর্শ অনুযায়ী, এতে অক্সিজেন থেরাপি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং প্রয়োজনে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।
গুরুতর রোগীদের আইসিইউতে ভর্তি রাখতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাও প্রয়োজন হতে পারে।
সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে বাড়ি ও কর্মস্থলে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছে সিডিসি। বিশেষ করে বেসমেন্ট, চিলেকোঠা বা দেয়ালের ফাঁকফোকর—যেসব পথ দিয়ে ইঁদুর ঘরে ঢুকতে পারে, সেগুলো বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইঁদুরের মল বা দূষিত স্থান পরিষ্কার করার সময় মাস্ক ও সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে, যাতে দূষিত বাতাস শরীরে প্রবেশ করতে না পারে।
### সাম্প্রতিক আর কোন ঘটনা সামনে এসেছে?
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়ার মৃত্যুর পেছনেও হান্টাভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত এইচপিএস ধরনে আক্রান্ত হয়েই তার মৃত্যু হয়েছিল।
যে বাড়িতে তাকে পাওয়া যায়, সেখানে ইঁদুরের বাসা ও মৃত ইঁদুরের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে তিনি অনলাইনে ফ্লু ও কোভিডের উপসর্গ সম্পর্কেও খোঁজ করেছিলেন।
### ‘মহামারির সূচনা নয়’
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এমভি হন্ডিয়াসে হান্টাভাইরাসের এই সংক্রমণকে কোনোভাবেই নতুন মহামারির সূচনা হিসেবে দেখার কারণ নেই।
সংস্থাটির সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কেরখোভে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির সঙ্গে এ ঘটনার কোনো মিল নেই। কারণ হান্টাভাইরাস মূলত ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়।
তিনি বলেন, সাধারণত এই ভাইরাস ইঁদুরজাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
ডব্লিউএইচও আরও জানায়, হামের মতো অত্যন্ত দ্রুত ছড়ানো রোগের তুলনায় হান্টাভাইরাসের অ্যান্ডিস স্ট্রেইন অনেক কম সংক্রামক। ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।
বৃহস্পতিবারের ব্রিফিংয়ে মারিয়া ভ্যান কেরখোভে বলেন, ‘এটি কোভিড নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে ছড়ায়।’ তিনি আরও জানান, জাহাজটিতে সবার জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া সন্দেহভাজন রোগীদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি কিংবা যারা তাদের সেবা দিচ্ছেন, তাদের উচ্চমাত্রার ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একই ব্রিফিংয়ে ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন, বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বর্তমানে কম বলেই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম শনাক্ত হওয়া দুই আক্রান্ত ব্যক্তি আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়ের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণ করেছিলেন। তারা এমন কিছু স্থানে পাখি দেখতে গিয়েছিলেন, যেখানে ভাইরাস বহনকারী ইঁদুরের উপস্থিতি রয়েছে বলে জানা যায়।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, যাত্রীদের সংস্পর্শে আসা আরও কয়েকজনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, হান্টাভাইরাসের ইনকিউবেশন সময় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে সামনে আরও কিছু সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

















