নির্ভীক কন্ঠ: ডিজিটাল রিপোর্ট ৬ জুলাই ২০২৬ , ১২:৩৯:০৫ প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) সংক্রান্ত গেজেট চলতি জুলাই মাসে প্রকাশ করা হচ্ছে না। যদিও অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণায় ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার কথা বলা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার হালনাগাদের কাজ শেষ করে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং বিদ্যমান ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে গেজেট জারি করা। এ কারণেই নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে গেজেট পরে প্রকাশ পেলেও নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই গণনা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়াসহ বর্ধিত বেতনের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন বেতনের হার, ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের সময় এবং অবসরপ্রাপ্তদের প্রাপ্য সুবিধা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গেজেট প্রকাশে বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ সফটওয়্যারভিত্তিক জটিলতা। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সময় অধিকাংশ কাজ ম্যানুয়ালি সম্পন্ন হলেও বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও জিপিএফসহ প্রায় সব আর্থিক কার্যক্রম ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করতে গেলে সফটওয়্যারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, এখন আর আগের মতো হাতে বেতন নির্ধারণের সুযোগ নেই। যদি একাধিক ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হয়, তাহলে একই কর্মচারীর জন্য বারবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে। এতে সফটওয়্যারে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা এবং ভুলের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং অবসর-সংশ্লিষ্ট সুবিধা নির্ধারণেও অতিরিক্ত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। কারণ, তাদের পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ছুটির নগদায়নসহ অধিকাংশ আর্থিক সুবিধা সর্বশেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। ডিজিটাল ব্যবস্থায় দুই বা তিন ধাপে অবসরকালীন সুবিধা সমন্বয়ের সুযোগ না থাকায় ভবিষ্যৎ প্রাপ্যতা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
এই পরিস্থিতিতে আব্দুল মালেক প্রস্তাব দিয়েছেন, প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করা হোক। এরপর বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা ধাপে ধাপে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, এতে সফটওয়্যার সংশোধনের চাপ কমবে এবং অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্যের আশঙ্কাও থাকবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যার সামঞ্জস্য এবং প্রশাসনিক বিষয়গুলো বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি পর্যালোচনা করছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

















