সারাদেশ

ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত ইমামের ক্ষতিপূরণ দাবি, ধর্ষক ছিলেন ভুক্তভোগীর ভাই

  প্রতিনিধি ৯ মে ২০২৬ , ১:০৬:১৭ প্রিন্ট সংস্করণ

ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)। ছবি: সংগৃহীত

ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্ত হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর অবশেষে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন ইমাম ও মক্তব শিক্ষক মোজাফফর আহমদ (২৫)।

ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোজাফফর আহমদের কোনো জৈবিক সম্পর্ক নেই। এর ভিত্তিতে আদালত তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়। একই সঙ্গে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে যে, ওই সন্তানের জৈবিক পিতা কিশোরীর সহোদর বড় ভাই মোরশেদ।

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রকৃত ঘটনা গোপন করতে এবং মোরশেদকে আড়াল করতেই ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের পর গত ১৭ এপ্রিল আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে মোজাফফরকে অব্যাহতি দিয়ে মোরশেদকে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৯ সালে মক্তবের পড়াশোনা শেষ করে ওই কিশোরী। পরে ২০২৩ সালে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়।

ঘটনার পর ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর পরিবার মক্তব শিক্ষক মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। মামলার পরপরই তিনি চাকরি হারান। ২৬ নভেম্বর মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে আদালতে গেলে সেখান থেকেই তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পরে তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগ করেন। ২৮ ডিসেম্বর জামিনে মুক্ত হয়ে শুরু করেন আইনি লড়াই।

মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর মোজাফফরকে ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়। পরীক্ষার ফলাফলে তার সঙ্গে শিশুটির কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এরপর পুলিশ কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে সে স্বীকার করে, তার বড় ভাই মোরশেদ দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করত।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৯ মে মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অপরাধ স্বীকার করেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। একই বছরের আগস্টে কিশোরী, নবজাতক শিশু ও মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে প্রতিবেদনে নিশ্চিত হয়, শিশুটির জৈবিক পিতা মোরশেদ। ডিএনএ রিপোর্টে তার সঙ্গে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া যায়।

এরপর তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শরীফ হোসেন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়ে মোজাফফরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন করেন এবং মোরশেদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় অভিযোগ গঠন করেন। বর্তমানে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে আছেন।

ভুক্তভোগী ইমাম মোজাফফর আহমদ বলেন, এ ঘটনার পর তিনি সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কারামুক্ত হওয়ার পর কোনো মসজিদে আর চাকরি পাননি। মামলার খরচ চালাতে নিজের বসতভিটাও বিক্রি করতে হয়েছে। ঘটনার পর যথাযথ তদন্ত ছাড়াই স্থানীয় কিছু মানুষ তার বাড়িতে হামলাও চালায়। তিনি প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান এবং সরকারের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন।

মোজাফফরের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, “এটি অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে এসেছে।”

জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, “তিনি একজন মজলুম ইমাম। তার সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির দায় কে নেবে? তাকে যথাযথ আইনি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।”

পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, “ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার পর চার্জশিট থেকে মোজাফফরের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত অভিযুক্ত ভুক্তভোগীর বড় ভাই। নিরপরাধ একজন মানুষকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছিল।”

আরও খবর

Sponsered content