বিশ্ব সংবাদ

ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুসিচের পদত্যাগ

  নির্ভীক কন্ঠ : ডিজিটাল ডেক্স ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৪:০৭:৫১ প্রিন্ট সংস্করণ

সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুসিচ। । ছবি: সংগৃহীত

এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ব্যাপক জনঅসন্তোষের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুসিচ। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে দীর্ঘদিনের বিক্ষোভের পর তার সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ তৈরি হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আগামী ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে চলতি বছরেই দেশটির জনগণকে সংসদ ও প্রেসিডেন্ট—দুই নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজের দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে লড়বেন ভুসিচ।

পদত্যাগের আগে রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন ভুসিচ। সেখানে তিনি বলেন, প্রায় নয় বছর ক্ষমতায় থাকার সময়ে তার সরকার সার্বিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। পরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন।

এর আগে গত জুনে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ভুসিচ। একই সঙ্গে আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার দল থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না। ফলে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ ভুসিচের নেই।

রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত ভুসিচ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়মকানুন উপেক্ষা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই ক্ষোভকে ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ দেয়। পরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পাশাপাশি শ্রমিক, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নোভি সাদ রেলস্টেশনের দুর্ঘটনা ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে থাকা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। সংস্কারকাজের পর রেলস্টেশনটিকে সার্বিয়ার অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা এ ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানান।

আন্দোলনের চাপের মধ্যে ভুসিচ সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পদত্যাগ করলেও বিক্ষোভ থামেনি। দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে কর্মসূচি অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভুসিচের বর্তমান মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পদত্যাগের পর দেশটির সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সার্বিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে হবে। ফলে চলতি বছরের শেষ হওয়ার আগেই দেশটিতে দুই দফা জাতীয় নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ভুসিচ জানিয়েছেন, ২৫ অক্টোবরের আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে আগাম নির্বাচন আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবিতে পরিণত হয়েছিল।

এর আগে ভুসিচ জানিয়েছিলেন, সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতা হিসেবে তিনি আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন। ফলে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পরও দেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সক্রিয় থাকার পথ খোলা রাখছেন তিনি।

নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন সার্বিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ। ভুসিচ পদত্যাগের পর ২৮ সেপ্টেম্বর তার কাছে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

পদত্যাগের আগে সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ৪৯ জনকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্তের কথাও জানান ভুসিচ। তাদের মধ্যে ২৩ জন গত দেড় বছরের বিভিন্ন আন্দোলন ও ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে তিনি জানান। এদের মধ্যে নোভি সাদ-সংশ্লিষ্ট একটি গ্রুপের ১২ জন এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত অন্য ১১ জনও ছিলেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ‘স্টুডেন্টস উইন’। পাশাপাশি পশ্চিমাপন্থি বিরোধী দলগুলোর জোটও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল আগাম নির্বাচন।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন ভুসিচ। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ২০২২ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পান।

পররাষ্ট্রনীতিতে ভুসিচ একদিকে সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। একই সময়ে চীনা বিনিয়োগের জন্যও সার্বিয়ার অর্থনীতিকে উন্মুক্ত রাখার নীতি অনুসরণ করেছেন।

আরও খবর

Sponsered content